জুলাই ঘোষণাপত্রে কি আছে? ছাত্র জনতার গণভোটানের পর থেকে বহুল প্রত্যাশিত জুলাই ঘোষণাপত্র আজ মঙ্গলবার ৫ আগস্ট ঘোষণা করছেন অন্তবতিকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মোহাম্মদ ইউনুস।

এই ঘোষণাপথে রাষ্ট্রের সংবিধানে প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগীয় সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের বীর হিসেবে ঘোষণা করা হয় যা আন্দোলনকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।

রাজধানীর মানিক মিয়ার এভিনিউতে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান উপদেষ্টা এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে যে ছাত্র গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এই ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।

জুলাই ঘোষণাপত্রে কি আছে? ২৮ দফায়

১. যেহেতু উপনিবেশ বিরোধী লড়াইয়ের সুদীর্ঘকালে ধার্মিকতা এই ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ 23 বছর পাকিস্তান স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচারে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য রক্তকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।

২. যেহেতু বাংলাদেশের অপমার জনগণ দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভূখণ্ডে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র বিবৃতি সাম্য মানব মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে।

৩. যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন পদ্ধতি এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের ফলে স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধ জন আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। এবং গণতন্ত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুন্ন করেছিল।

৪. যেহেতু স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে বাকশাল নামে সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করে এবং মতামত প্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালে ৭ নভেম্বর দেশের সিপাহী জনতা ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে একদলীয় বাৎসাল পদ্ধতির পরিবর্তে বহু দলীয় গণতন্ত্র মত প্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রবর্তনের পথ শুরু হয়।

৫. যেহেতু আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসন এর বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় বছর ছাত্র-জনতার অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং 1991 সালে পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

৬. যেহেতু বেশি বিদেশি চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় 11 এর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের শেখ হাসিনার এক ছত্র ক্ষমতা অধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করা হয়।

৭. যেহেতু গত দীর্ঘ ষোল বছরের ফ্যাসিবাদী অগণতান্ত্রিক এবং গণবৃদ্ধি শাসন ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে এবং একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অতি উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার অভিপ্রায় সংবিধানের অবৈধ অগণতান্ত্রিক পরিবর্তন করা হয় এবং যার ফলে একদলীয় এক শত্রু ক্ষমতা ও অধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।

৮. যেহেতু শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন গুন খুন আইন বর্ণিত হত্যাকাণ্ড মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং নির্দলীয় স্বার্থের সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তন বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে ধ্বংস করে।

৯. যেহেতু হাসিনা সরকারের আমলে তারাই তারই নেতৃত্বে একটি চরম গণবিরোধী এক নায়ক তান্ত্রিক ও মানবাধিকার হরণকারী শক্তি বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদী মাফিয়া এবং ব্যর্থ রাষ্ট্রের রূপ দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের মূর্তি ক্ষুন্ন করে।

নির্বাচনের তারিখ জানালেন আইন উপদেষ্টা

ওয়েবসাইট কিনুন কম দামে

জুলাই ঘোষণাপত্রে কি আছে?

১০. যেহেতু তথা কথিত উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী নেতৃত্বে সীমাহীন দুর্নীতি ব্যাংক লুট অর্থ পাচার ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বিগত পতিত দুর্নীতি বা আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ ও এর অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং এর পরিবেশ প্রাণ বৈচিত্র জলবায়ুর বিপন্ন করে।

১১. যেহেতু শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সর্বস্তরের জনগণ গত প্রায় ১৬ বছর যাবত নিরন্তর গণতান্ত্রিক সংগ্রাম করে জেল জুলুম হামলা মামলা খুন-গুম ও বিচারপতি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

১২. যেহেতু বাংলাদেশে বিদেশি রাষ্ট্রের অন্যায় প্রভুত্ব, শোষণ ও খবর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষের ন্যায় সংগত আন্দোলনকে বহির শক্তির তাবেদার আওয়ামী লীগ সরকার নিষ্ঠুর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করে।

১৩. যেহেতু অবৈধভাবে ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার তিনটি প্রহসনে নির্বাচন ২০১৪ ২০১৮ ও ২০২৪ এর জাতীয় নির্বাচন এদেশের মানুষকে ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করে।

১৪. যেহেতু আওয়ামী লীগ আমলে ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতা কর্মী শিক্ষার্থী ও তরুণদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সরকারি চাকরিতে একচেটিয়া দলীয় নিয়োগ প্রথাভিত্তিক বৈষম্যের কারণে ছাত্র চাকরি প্রত্যাশীয় নাগরিকদের চরম ক্ষোভের জন্ম হয়।

১৫. যেহেতু বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের চরম নিপীড়নের ফলে দীর্ঘদিন ধরে জনসে সৃষ্টি হয় এবং জনগণ সকল বৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই চালিয়ে যায়।

১৬. যেহেতু সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক উঠা ব্যবস্থার বিলোপ ও দুর্নীতিপ্রধান প্রতিরোধে বৈষম্যবৃদ্ধি ছাত্র আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক ব্যাপক দমন নিবারণ বর্বর অত্যাচার ও মানবতা বিরোধী হত্যাকাণ্ড চালানো হয় যার ফলে সারাদেশে দল মত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণ অভ্যুত্থান রূপ নেয়।

১৭. যেহেতু খেছিস শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দল ধর্মীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক পেশাজীবী শ্রমিক সংগঠন সহ সমাজের সকল স্তরে মানুষ যোগদান করে এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বাহিনী রাজপথে নারী শিশুসহ প্রায় এক হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। অগণিতিক মানুষ গঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক বাহিনী সদস্যগণ জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন প্রদান করে।

১৮. যেহেতু অবৈধ শেখ হাসিনা সরকারের পতন ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের লক্ষ্যে বৈষম্য বিরতি ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জনগণ অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ পরিচালনা করে এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনরত সকল রাজনৈতিক দল ছাত্র জনতা তথা সর্বস্তরের সকল শ্রেণীর পেশার অপমার জনসাধারণের তীব্র আন্দোলনে চূড়ান্ত পর্যায়ে গণভবন মুখী জনতার উৎপল যাত্রার মুখে শেখ হাসিনার ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

১৯. যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবেলায় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রত্যয় ও প্রয়োগ রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

২০. যেহেতু জনগণের দাবি অনুযায়ী এরপর অবৈধ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের মতামতের আলোকে সাংবিধানিকভাবে ডঃ মোঃ ইউনুসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট ২০২৪ তারিখে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়।

২১. যেহেতু বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের ফ্যাসিবাদ বিরোধী তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ বৈষম্য ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণের অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়।

২২. সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ সুশাসন অসুস্থ নির্বাচন বেশি শাসনের পুনাবৃত্তি রোধ আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধানও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।

২৩. সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ বিগত ১৬ বছরের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম কালে এবং ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন সময়ে ফ্যাসিড আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক সংঘটিত গুণ কোন হত্যা গণহত্যা মানবতা বিরোধী অপরাধ সকল ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুন্ঠনের অপরাধসমূহের দ্রুত উপযুক্ত বিচারের দৃঢ় অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।

২৪. সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণভোটানের শহীদদের জাতীয় বিয়ে হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার আহতযোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।

২৫. সেতু বাংলাদেশের জনগণ যুক্তিসঙ্গত সময়ে আয়োজিত অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুতি প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আইনের শাসন ও মানব অধিকার শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন ও মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।

২৬. সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে যে একটি পরিবেশ ও জলবায়ু সহিষ্ণু অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল এর মাধ্যমে বর্তমান ভবিষ্যতের জন্মের অধিকার সংরক্ষিত হবে।

২৭. বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে যে ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের ২০২৪ এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এই ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে।

২৮. ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।

aajkal bangla